মাসিকের সময় পেটে ব্যথার (Dysmenorrhea) কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা

মাসিকের সময় পেটে ব্যথার (Dysmenorrhea) কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিরোধে আকুপাংচারের ভূমিকা | Dr S.M. Shahidul Islam

পিরিয়ড বা মাসিকের সময় পেটে ব্যথা এর সমস্যাটি নারীদের ক্ষেত্রে খুবই সাধারন একটি বিষয়। সাধারণত পিরিয়ড চলা কালীন তল পেটে এই ব্যাথা থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যাথা অতি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে এর তীব্রতা অনেক বেশি বেড়ে যায়। তবে সবার ক্ষেত্রে এই ব্যাথা একই জায়গায় থাকে না।

দীর্ঘদিন এমন অস্বাভাবিক পিরিয়ডের ব্যাথার চিকিৎসা হিসেবে আকুপাংচার খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। আকুপাংচার একটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কোন প্রকার ঔষধ ছাড়া মাসিকের ব্যাথা দূর করা যায়। বাংলাদেশে অবস্থিত শশী হাসপাতালে আকুপাংচার চিকিৎসার মাধ্যমে মাসিকের সময় পেটে ব্যথার চিকিৎসা করা হয়।

ডিসমেনোরিয়া কি? (What is Dysmenorrhea)

মাসিকের ব্যথা অত্যন্ত বেদনাদায়ক যাকে ডিসমেনোরিয়া (Dysmenorrhea) বলা হয়। এটি গ্রীক শব্দ ডিস (Dys)মেনোরিয়া (Menorrhea) শব্দ যোগে এসেছে। ডিস শব্দের অর্থ ‘ব্যথা বা যন্ত্রণা’ আর মেনোরিয়া অর্থ ‘মাসিকের রক্তপ্রবাহ’। অর্থাৎ একজন নারীর মাসিক শুরু হওয়ার আগে বা মাসিক চলাকালীন সময় যে দুঃসহ ব্যথা হয় তাকে ডিসমেনোরিয়া বলে। আবার রক্তস্রাব শেষ হওয়ার সাথে সাথে ব্যথাও কমে যায়। এই ব্যথার যন্ত্রণায় প্রত্যেক নারী ভুগে থাকেন।

মাসিকের সময় পেট ব্যথা হয় কেন? (পেটে ব্যাথার প্রধান কারণ)

মাসিকের সময় অনেক নারীর তলপেট বা কোমর ব্যথা অনুভব করেন। তবে শুধু ব্যথা নয়; কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যথা দৈনন্দিন কাজ, ঘুম বা মানসিক স্বস্তিতে বাধা দিতে পারে। নিচে এমন কারণগুলো দেয়া হলো যেগুলো সাধারণত পেটে বা কোমরে তীব্র ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়:

১. প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের অতিরিক্ত নিঃসরণ: মাসিকের সময় শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামের রাসায়নিকের মাত্রা বাড়ে। এই রাসায়নিক জরায়ুর পেশিকে সংকুচিত (contract) করতে সাহায্য করে। যদি এই সংকোচন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ও তীব্র হয়, তাহলে ক্র্যাম্প, পেট ব্যথা, মাথা ঘোরা বা বমিভাব অনুভূত হতে পারে।

২. জরায়ুর পেশিতে অতিরিক্ত সংকোচন (Strong Uterine Contraction): জরায়ুর পেশি যখন খুব জোরে সংকুচিত হয়, তখন পেটের নিচের অংশ ও কোমরে চাপ অনুভূত হয়। রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ায় টিস্যুতে অক্সিজেন ও পুষ্টির ঘাটতি হয়, যার ফলে ব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দেয়।

৩. Endometriosis: এই অবস্থায় জরায়ুর অভ্যন্তরীণ টিস্যু শরীরের অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও গজায় যেমন পেট, ডিম্বাশয় বা পেলভিক অঞ্চলে। প্রতিবার মাসিকের সময়, এই টিস্যু ফোলা বা প্রদাহগ্রস্ত হয়, যার ফলে গভীর ব্যথা, অতিরিক্ত ব্লিডিং, এবং গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে।

৪. Uterine Fibroid: জরায়ুর বা পেলভিক অঞ্চলে ফাইব্রয়েড (non-cancerous গ্রোথ) থাকলে, মাসিকের সময় গুরুতর পেট ব্যথা, ভারী রক্তপাত এবং চাপের অনুভূতি হতে পারে।

৫. Pelvic Inflammatory Disease (PID) বা প্রজনন অঙ্গের ইনফেকশন: যদি পেলভিক অঞ্চলে ইনফেকশন বা প্রদাহ থাকে, তাহলে মাসিকের সময় ব্যথা, জ্বর, অস্বস্তি ও অস্বাভাবিক স্রাব দেখা দিতে পারে।

৬. সার্ভিক্স সংশ্লিষ্ট সমস্যা (যেমন সার্ভিক্যাল স্টেনোসিস): কিছু ক্ষেত্রে জরায়ুর মুখ (Cervix) খুব সুস্পষ্টভাবে সংকুচিত বা সংকীর্ণ থাকলে, রক্ত সহজে বের হতে পারে না। ফলে মাথা ঘোরা, ব্যথা ও অতিরিক্ত চাপ অনুভূত হয়।

৭. Adenomyosis: এই অবস্থায় জরায়ুর অভ্যন্তরীণ টিস্যু জরায়ুর পেশির মধ্যে প্রবেশ করে যায়। মাসিকের সময়, জরায়ু ফুলে গিয়ে ব্যথা ও ভার অনুভূত হয়, এবং মাসিক দীর্ঘ বা ভারী হতে পারে।

৮. স্ট্রেস, হরমোনাল পরিবর্তন ও লাইফস্টাইল ফ্যাক্টর: অত্যধিক মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম, অপর্যাপ্ত পানি পান, ফাস্ট ফুড বা পুষ্টিহীন খাবার, ব্যায়ামের অভাব এসব ফ্যাক্টর প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নিঃসরণ বাড়াতে পারে। ফলে মাসিকের ব্যথা তীব্র হতে পারে।

মাসিকের সময় পেট ব্যথার সাধারণ লক্ষণ (Symptoms of Dysmenorrhea) 

মাসিকের ব্যথা শুধুমাত্র পেটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো শরীরের স্বাভাবিক রুটিন ও শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। নিচে রোগীরা যেসব লক্ষণ বেশি জানান, সেগুলো তুলে ধরা হলো:

১. নিচের পেট, কোমর ও উরুতে ব্যথাঃ মাসিকের ব্যথা সাধারণত নিচের পেট থেকে শুরু হয়ে কোমর ও উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ব্যথা কখনও হালকা টান, আবার কখনও তীব্র ক্র্যাম্পের মতো অনুভূত হতে পারে।

২. বমিভাব, মাথা ঘোরা ও অস্বাভাবিক ক্লান্তিঃ প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের মাত্রা বেশি হলে বমিভাব, মাথা হালকা লাগা, দুর্বলতা এবং ঘনঘন ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। অনেক নারী মাসিকের প্রথম ১–২ দিনে এই উপসর্গ সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন।

৩. অতিরিক্ত বা ভারী রক্তপাত (Heavy Bleeding): মাসিকের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ব্লিডিং, রক্তের জমাট (clots) বের হওয়া, বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত ডিসমেনোরিয়ার সাধারণ লক্ষণ হতে পারে—বিশেষ করে ফাইব্রয়েড বা অ্যাডেনোমাইওসিস থাকলে।

৪. পেটে ভারীভাব বা চাপের অনুভূতিঃ অনেক সময় পেটের নিচের অংশে ভারীভাব, চাপ বা টান টান অনুভূতি তৈরি হয়। জরায়ুর পেশির সংকোচন ও প্রদাহের কারণে এটি সাধারণ।

৫. মুড পরিবর্তন ও মানসিক অস্থিরতাঃ মাসিকের সময় হরমোনাল ফ্লাকচুয়েশন বেশি থাকে, যার ফলে খিটখিটে মেজাজ, মন-মেজাজ ওঠানামা, দুশ্চিন্তা বা আবেগের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

আকুপাংচার চিকিৎসার মাধ্যমে পিরিয়ডের ব্যাথার সমাধান পাওয়ার গল্প জানুন রোগীর নিজের মুখে

ক) প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া –

সাধারণত একজন নারীর ২৫ বছরের আগে এই ব্যথা হয়। পিরিয়ডের সাথে সাথে মাসিকের সময় পেটে ব্যথা, তীব্র হয় এবং বমিও হতে পারে। এই ব্যথা সাধারণত ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত থাকে। প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া হলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয় তা হলোঃ

  • তলপেটে ব্যথা
  • বমি বমি ভাব
  • উদরাময়
  • উদ্বেগ বা প্রদাহ
  • উরু বা নিতম্বে ব্যথা
  • মাথা ব্যথা বা ঝিনঝিন করা

খ) সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া –

এটি বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। যা সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে হয়। যেমন – ওভারিয়ান সিস্ট, এন্ডোমেট্রিওসিস, ফাইব্রয়েড, যোনি পথে সংক্রমণ প্রভৃতি কারণে সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া হয়ে থাকে। সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়ার কিছু লক্ষণ হলোঃ

  • পেটে ব্যাপক ব্যথা
  • সর্দি ও জ্বর হতে পারে
  • যৌন মিলনের সময় ব্যথা হওয়া
  • রক্ত জমাট বাঁধা
  • পিরিয়ড অনিয়ম
  • প্রস্রাবের সময় প্রদাহ

মাসিকের সময় পেট ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায় (Home Remedies for Menstrual Pain Relief)  

মাসিকের সময় অনেক নারী পেট বা কোমর ব্যথা, মাথা ঘোরা ও ক্লান্তি অনুভব করেন। ঘরোয়া কিছু সহজ উপায় অবলম্বন করে এই ব্যথা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। যেমনঃ

১. গরম কম্প্রেস (Use Warm Compress)

  • হালকা গরম পানির ব্যাগ বা হিটিং প্যাড পেটের নিচের দিকে রাখুন।
  • গরম ব্যাগ পেশি শিথিল করে, ব্যথা ও ক্র্যাম্প কমায়।
  • দিনে ১৫–২০ মিনিট ব্যবহার করলেও আরাম পাওয়া যায়।

২. হালকা ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং (Light Exercise & Stretching)

  • ওয়াকিং, যোগব্যায়াম বা হালকা স্ট্রেচিং মাসিকের সময় রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
  • পেশির টান কমিয়ে ব্যথা হ্রাস করে।
  • প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট হালকা এক্সারসাইজ খুব কার্যকর।

৩. পর্যাপ্ত পানি পান (Stay Hydrated)

  • পর্যাপ্ত পানি পান করলে পেট ফোলা কমে।
  • হালকা লবণমুক্ত এবং গরম পানির ব্যবহার ভালো প্রভাব ফেলে।

৪. পুষ্টিকর খাবার (Balanced Diet)

  • ম্যাগনেসিয়াম, ওমেগা-৩, ভিটামিন B ও D সমৃদ্ধ খাবার (বাদাম, ডিম, মাছ, শাকসবজি) ব্যথা
  • হ্রাসে সাহায্য করে।
  • অতিরিক্ত কফি, চিনি বা জাঙ্ক ফুড কমানো ভালো।

৫. স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ (Stress Management)

  • মেডিটেশন, ডিপ ব্রিদিং, হালকা মিউজিক বা aromatherapy পদ্ধতি মাসিকের ব্যথা কমাতে সহায়ক।
  • স্ট্রেস হরমোন প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের মাত্রা বাড়াতে পারে, তাই মানসিক শান্তি গুরুত্বপূর্ণ।

৬. হালকা ওষুধ (OTC Pain Relief)

  • যদি ঘরোয়া উপায় যথেষ্ট না হয়, প্যারাসিটামল বা ইবুপ্রোফেন সংক্ষেপে ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ওষুধ নেওয়ার আগে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।

যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে কিংবা অসস্তিকর কোন ব্যথা অনুভব করলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা সবচেয়ে উত্তম পন্থা।

ডিসমেনোরিয়া বা পিরিয়ডের ব্যাথা প্রতিরোধে আকুপাংচারের ভূমিকা

আকুপাংচার একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১০০ টিরও বেশি অবস্থার জন্য আকুপাংচার সুপারিশ করেছে। আকুপাংচারের মাধ্যমে ডিসমেনোরিয়া সমস্যার সমাধান (Dysmenorrhea treatment by acupuncture) দেয়। আকুপাংচারের মাধ্যমে শরীরের নির্দিষ্ট আকুপয়েন্টে অতি পাতলা সূঁচ ফুটানো হয়। এই ক্ষেত্রে, আকুপাংচার দেওয়ার আগে জায়গাটি পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। আকুপাংচার ব্যথা কমাতে, প্রদাহ কমাতে, পেশীর খিঁচুনি উপশম করতে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

বাংলাদেশে তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান হল শশী হাসপাতাল। যেখানে প্রধান চিকৎসা ব্যবস্থা হল আকুপাংচার। যেখানে বাংলাদেশের সেরা আকুপাংচার স্পেশালিষ্ট ডা. এস.এম. শহীদুল ইসলামের তত্বাবধানে ডিসমেনোরিয়ার জন্য আকুপাংচার চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছড়ামাসিকের সময় পেটে ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া রোগ নিরাময়ে অনেক সময় আকুপ্রেশার চিকিৎসা প্রদান করা হয়। আকুপ্রেশার দেওয়ার ফলে স্মৃতি শক্তি বাড়ে, চোখের দৃষ্টি শক্তি বাড়ে, কানের শ্রবণ শক্তি বাড়ায়, চেহারার উজ্জ্বলতা বাড়ায়, ঘাড়ের প্রদাহ কমায়, মাথা ব্যথা কমে এবং ঘুমের উন্নতি হয়। আপনিও শশী হাসপাতালে আসতে পারেন, এসে চিকিৎসা নিতে পারেন। শশী হাসপাতাল আপনার সেবার জন্য সবসময় প্রস্তুত।

মাসিকের সময় পেটে ব্যাথা হওয়াটা স্বাভাবিক একটা বিষয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে তীব্র ব্যাথা হতে পারে। এক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এ ছাড়াও ঘরোয়া কিছু উপায়ে প্রাথমিক ভাবে ব্যাথা উপশম করা যেতে পারে। সেগুলো হল: হিটিং প্যাড ব্যাবহার করা, পেটের নিচের অংশে আলতোভাবে ম্যাসাজ করা, যোগব্যায়াম, প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা ইত্যাদি।

সাধারণত পিরিয়ড শুরু হওয়ার থেকে শুরু হয় এই ব্যাথা। আবার কারো ক্ষেত্রে এ ব্যাথা মাসিক হওয়ার দুই একদিন আগেও শুরু হতে পারে। মাসিক বা পিরিয়ডের ব্যাথা সাধারণত ৪৮ থেকে ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর সময় আরও বেশি হতে পারে। মূলত, মাসিকের সময় বেশি রক্তক্ষরণের সময় ব্যাথা বেশি হয়।

মাসিক বা পিরিয়ডের সময় সাধারণত পেটের নিচের অংশে অর্থাৎ তলপেট, জরায়ুর চারপাশে হয়ে থাকে। অনেক সময় এ ব্যাথা কোমর, উরু, পা বা পিঠেও ছড়িয়ে যেতে পারে।